চট্টগ্রাম শহরের এক বেসরকারি স্কুলের স্বল্প বেতনের এক শিক্ষিকাকে ঘিরে সম্প্রতি আলোচনার ঝড় উঠেছে। মাসিক আয়ের তুলনায় রাজকীয় চলাফেরা এবং তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে শত কোটি টাকার বিপুল সম্পদে শুধু স্কুল কর্তৃপক্ষ নয়, সরকারের বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এত সম্পদের উৎস কোথায়?
সরকারের গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
বাংলাদেশ মহিলা সমিতি (বাওয়া) স্কুলের শিক্ষিকা সুলতানা রাজিয়ার জামাই হলেন একজন চতুর কানুনগো। যেখানেই গেছেন চাকরি সূত্রে সে এলাকার সরকারি ভূমির সেবার বারোটা বাজিয়েছেন। অসহায় নিরীহ সেবা প্রত্যাশীদের ন্যায় বিচার প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত করেছেন। বিনিময়ে ভূমি দস্যুদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন শত শত কোটি টাকা। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে কানুনগো মিজানুর রহমান দাপটের সাথে কাজ চালাতেন। সে সরকারের পতনের পর মিজানেরও পতন ঘটে।
অভিযোগ রয়েছে, গত ১০/১৫ বছরে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, জমি ও ব্যাংক ব্যালেন্স গড়ে উঠেছে শিক্ষিকার পরিবারের সদস্যদের নামে। তদন্ত সংস্থার প্রাপ্ত নথিতে দেখা যায়, এসব সম্পদের একটি বড় অংশ আত্মীয়-স্বজনের নামে ক্রয় করা হয়েছে। যাতে শিক্ষিকা ও তার স্বামী সরকারের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেন।
সুলতানা রাজিয়ার পিতা জামাল উদ্দিন আহমদ ছিলেন শহরের চট্টগ্রাম কাপ্তাই বাস-মালিক সমিতির অফিসের একজন সামান্য কর্মচারী। ৩ছেলে ও ২ মেয়ের সংসার চালানো তার পক্ষে মোটেই সহজ ও সম্ভব ছিলনা। সুলতানা রাজিয়ার স্বামী মিজানুর রহমান ভূমি অফিসে চাকুরির সুবাধে তার পিতা, মাতা, ভাই ও বোনরা হয়ে ওঠেন কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার বাসিন্দা মিজানূর রহমান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের ভূমি অফিসের কানুনগোর পদ ছেড়েছেন আগেভাগে। শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনেছেন এমন গুঞ্জন চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে তিনি আগেভাগে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন। টাকা বানানোর মেশিন কানুনগো মিজানের বদৌলতে সামান্য বেতনের
শিক্ষিকা অর্জন করেন অসংখ্য বাড়ি,গাড়ি, প্লট ও ফ্ল্যাট। এছাড়া অন্যান্য জেলাতেও তাদের রয়েছে বিপুল সম্পদ।
চট্টগ্রামের খুলশী থানার পূর্ব নাসিরাবাদ মৌজার জাকির হোসেন রোডে রয়েছে তিনটি বড় সাইজের ফ্ল্যাট। এগুলোর মূল্য প্রায় ৬ কোটি টাকা। পিতা জামাল উদ্দিনের নামে ক্রয়কৃত এ সব ফ্ল্যাট পরবর্তীতে শিক্ষিকার ২ মেয়ের নামে হেবা করে নেয়া হয়েছে।
পাহাড়তলী থানাধীন গ্রীণ ভিউ আবাসিক এলাকা এবং বায়েজিদ বোস্তামী থানার অধীনে রয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকার সম্পদ। জমি ক্রয় করে সেখানে বড় বড় দুটি বহুতল ভবন তৈরি করেন শিক্ষিকা।
প্রাথমিক তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকা, ফেনী, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও বান্দরবানে কানুনগো শিক্ষিকা ও স্বামী মিজানের বিভিন্ন নামে রয়েছে আরও ৭০-৮০ কোটি টাকার সম্পদ ও ব্যাংক ব্যালেন্স। চতুর এই কানুনগো দম্পতি কালো টাকা সাদাও করেছেন দফায় দফায়।
তথ্যানুসন্ধানে প্রকাশ, কানুনগো মিজানূর রহমানের আয়কর ফাইলে প্রথম দিকে এসব সম্পত্তির বিবরণ দেখা যায়নি। পরবর্তীতে জালিয়াতির মাধ্যমে কিছু সম্পদ আয়কর ফাইলে যুক্ত করেছেন।
পতিত সরকারের ১৭ বছরের পুরো সময়টাই সরকারি চাকরির জীবনকে টাকা বানানোর মেশিন হিসেবে ব্যবহার করেছেন এই মিজান। যেখানেই পোস্টিং নিয়ে গেছেন সেখানেই একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে তুলেছেন।
তার স্ত্রী ২০ হাজার টাকা বেতনে চট্টগ্রাম শহরের একটি বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করেন।তার আসা যাওয়ার সুবিধার্থে তাকে মিজান ৪০ লাখ টাকার এফপ্রিমিও প্রাইভেট কার কিনে দিয়েছেন। তার স্ত্রী সুলতানা রাজিয়ার নামে রয়েছে চট্টগ্রাম ও ফেনীতে বহু সম্পদ এবং ব্যাংক ব্যালেন্স।
ভূমির নথিপত্রে জালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া মিজান দুই মেয়েকে লেখা পড়া করান রাজকন্যার আদলে। সবশেষ ১কোটি ২০লাখ টাকা খরচ করে প্রাইভেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ইউএসটিসিতে এমবিবিএস পড়ান।
বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন প্রায় কোটি টাকা খরচ করে। রাজকীয় আয়োজন ছিল ফাইভস্টার হোটেলে। জামাতাকেও দিয়েছেন ঢাকায় কোটি টাকার ফ্ল্যাট উপহার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর নজরে এসেছে। সংস্থাটি প্রাথমিকভাবে সম্পদের উৎস, আয়কর নথি এবং লেনদেন যাচাই করছে। যথাযথ তদন্তের পর আয় ও সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।
স্থানীয়দের মধ্যেও এ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কেউ কেউ বলছেন, স্বল্প আয়ের পেশায় থেকেও এত বিপুল সম্পদের উৎস পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
দুদকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আয় ও সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
চট্টগ্রাম সমাচার/ইই
